মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলাম

   


       মানবাধিকার। মানব আর অধিকার এ দু’শব্দের যুক্তরূপ। অর্থাৎ মানুষের অধিকার। মানুষ নিজের জীবন যাপনের ক্ষেত্রে যে সকল অধিকারের মুখোমুখি হয় তাকেই মানবাধিকার বলা হয়। আর ইসলাম হচ্ছে পৃথিবীর বুকে আর্তমানবতার শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আল্লাহর একত্ববাদের নিঃশর্ত অনুসরনের জন্য সৃজিত একটি জীবন বিধান। ইসলাম সম্পর্কে আল্লাহ নিজেই পবিত্র কুরআনে সুরা আলে-ইমরানের ঊনিশ নং আয়াতে বলেছেন যে, আল্লাহর কাছে একমাত্র গ্রহনযোগ্য জীবন ব্যবস্থা হলো ইসলাম। আবার সর্বকালের শ্রেষ্ট মহামানব হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, আল্লাহ প্রত্যেক হক্বদারকেই তার হক্ব প্রদান করেন। এরপরে আবার অনেক বিজ্ঞজনদের মতে ইসলামই হচ্ছে একটি পূর্নাঙ্গ জীবন বিধান। এ কথার ভিত্তিতে ইসলামে মানবাধিকারের গুরুত্ব বা মূল্যয়নের পরিমান উপলব্ধ হয়। উপলব্ধ হয় যে, ইসলাম একজন মানুষের জন্মলগ্ন বরং জন্মের পূর্বে মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থা হতে শুরু করে মৃত্যু এবং মৃত্যু পরবর্তী জীবনে যে সকল অধিকারের মুখাপেক্ষি হয় সে সবই সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রনয়নকরত সকল ক্ষেত্রে তা ইনসাফের সাথে বাস্তবায়ন করেছে। পৃথিবীতে বসবাসকারী বর্তমান সাড়ে সাতশো কোটি মানুষের মধ্যে থেকেই যদি মানবাধিকারগুলো বিশ্লেষণ করা হয় এবং মানবাধিকারগুলোর যথাযথ ও ন্যায়সম্মত নীতিমালাগুলো দুনিয়ায় প্রচলিত ধর্মীয়, রাষ্ট্রীয়, সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক, প্রজাতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক, কুটনীতিক ইত্যাদি ব্যবস্থাপনার দিকে পৃথক পৃথক নিরপেক্ষভাবে দৃষ্টিপাত করলেই দেখা যায় একমাত্র ইসলামই সকল বিষয়ে দুরদর্শিতার সাথে সকল দিক পূর্নবিবেচনা করত পক্ষপাতিত্বহীন সমাধান প্রনয়ন করেছে। 
          এমন বহুল প্রচলিত মানবাধিকার সমূহের মধ্যে থেকে যদি মানুষের জন্ম ও তদপরবর্তি অধিকার নিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়, তবে দেখা যায় বর্তমান সময়ে মানুষ গর্ভাশয়ে সন্তান আসার পূর্বেই অনাগত ভবিষ্যত নষ্ট করে দেয়। আর যদিওবা ভুলক্রমে এসেও যায়, তাহলে তাকে বিভিন্ন আধুনিক ও নির্মম পন্থায় আপনপার থেকে পরপারে স্থানান্তরিত করা হয়। মানুষ এই জঘন্য কাজটির ছায়ায় আসে দুটি কারন হতে একটির উপস্থিতি আবার কেহ তো দুটিই অর্জনের ভাগ্য নিয়ে ঘুমোয়। একটি হচ্ছে অবৈধভাবে অনৈতিক কার্য সম্পাদন করত নৈতিকতার উথলে উঠার ফলে জেগে ওঠা আত্মমর্যাদাবোধ। আর অপরটি দারিদ্রতার ভয়বশত ও সুখী সংসার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। ইসলাম অনাগত শিশুর জন্মের পূর্ব থেকে তার অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অবৈধ ও অনৈতিক সম্পর্ক হারাম করে কঠিন শাস্তির বিধান রেখেছে। যাতে অন্যরাও এ ঘৃন্যকর্ম থেকে বিরত থাকে। আর দারিদ্রতার ভয়ের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, “দারিদ্রতার ভয়ে নিজ সন্তানদেরকে হত্যা করো না। কেননা আমিই তো তাদের ও তোমাদেরকে রিযিক দিয়ে থাকি । নিশ্চয়ই এভাবে সন্তানদেরকে হত্যা করা একটি মারাত্মক মূর্খতা ও বড় অন্যায়।” পক্ষান্তরে, পৃথিবীর অন্য সব জীবন ব্যবস্থাগুলোর দিকে যদি দৃষ্টিপাত করা হয়, তবে দেখা যায় যে, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার শ্লোগান তৈরী করতে কেউই কৃপনতা করেনি। কিন্তু, ইসলাম শ্লোগানের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকলেও ন্যায়ের বিচারে যথেষ্ঠ আগেই আছে। জন্ম পরবর্তি পরিস্থিতিও ঠিক এমনি হয়ে থাকে কিছুটা। উচ্চবিত্তরা সন্তান পালনের উদ্দেশ্যে নিম্নবিত্ত পরিবারের কাছে সন্তানকে সোপর্দ করে থাকে। (উল্লেখ্য যে, আমাদের নবীর সময়ে সঠিক আদব ও শুদ্ধ ভাষা শিক্ষার উদ্দেশ্যে সন্তানকে অন্য পরিবারে লালন-পালনের দায়িত্ব দেয়া হতো।) যদিও সন্তান নিজের বাবার ঘরেই বড় হয়, কিন্ত কেমন যেন সে একখানা পরগাছা ব্যতিরেকে কিছুই নয়। সন্তানের পিতা-মাতার মধ্য থেকে পিতা থাকে অতিমাত্রায় ব্যস্ত। ব্যস্ততা কখনো হয় সন্তানের ভবিষ্যতকে উজ্জল করার লক্ষ্যে, আবার কখনো বা হয় সন্তানের পৈত্রিক সম্পত্তিতে সন্তানের অবৈধ অংশীদার আনার লক্ষ্যে। আর মাতা মহীয়ষীর কথা না জানলেই নয় বরং, জানলেই ভাল হয়। তিনি তো এক উজ্জল আলোকিত পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যে পরম মমতায় সযত্নে কখনো কুকুর পোষেন কখনোবা বিড়াল। আর নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোতে তো নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। এসব পরিবারের সন্তানেরা শিশু বয়স থেকেই স্বাবলম্বী হতে শেখে। নিজেদের হাতখরচ কখনো ঠোটখরচ যোগাড় করা থেকে শুরু করে আরেক শতাব্দির প্রজনন ব্যবস্থায় নিজেরাই নিজেদের অঘোষিত অভিভাবক। আর মধ্যবিত্তরা উভয় দলেই থাকে পরিবেশ ও আবহাওয়া বিবেচনায়। এই সামাজিক বন্টন ব্যবস্থাটা অধিকাংশের ক্ষেত্রে না হলেও মোটামুটি উল্লেখযোগ্য একটা শ্রেনীই এর অর্ন্তভূক্ত। এক্ষেত্রে ইসলাম সন্তান পালনের ব্যাপারে কুরআন ও হাদিসের মাধ্যমে অনেক দিক-নির্দেশনা ও পুরস্কারের ঘোষনা করেছে।
  মানবাধিকারের একটি অন্যতম বিষয় হচ্ছে মানুষের জান ও মালের নিরাপত্তা। এই অধিকার যথাযথ ন্যায়সম্মত পন্থায় আদায়ের ক্ষেত্রে একমাত্র ইসলাম ব্যাতিত আর কোন জীবন ব্যবস্থার মধ্যেই দেখা যায় না। নিরাপত্তা অধিকারের মধ্যে সর্বপ্রথম যদি আমরা আত্মহত্যার দিকে তাকাই তাহলে দেখব যে আত্মহত্যাকারীর ব্যাপারে ইসলাম কতটা কঠোরতা আরোপ করেছে। অপরদিকে আত্মহত্যাকারী যদি বড় কোন ব্যক্তিত্ব হয় তাহলে সে দুনিয়ার মানুষের কাছে আরো প্রিয় ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠে। যার ফলে মানুষ তাকে দেখে অনুপ্রানিত হয়। আর যদি বড় কোন ব্যক্তিত্ব না হয়ে থাকে তাহলে তার পরিবারকে সমাজে হেয় করে দেখা হয়। ইসলাম আত্মহত্যাকারীকে পরকালে কঠিন শাস্তির হুমকি দিয়েছে। যার দ্বারা মানুষকে মানবতার চরম বিপর্যয় থেকে উদ্ধারের এক অকৃত্রিম পথ তৈরী হয়েছে। কেউ যদি কারো কোনো অঙ্গ কর্তন করে তাহলে ইসলাম সমপরিমান শাস্তির বিধান রেখেছে, যাতে করে মানুষ এ ব্যাপারে সাবধান হয়ে যায়। ফলে মানুষ তার খোদাপ্রদত্ত সমস্ত অঙ্গ প্রতঙ্গ নিয়ে সুস্থ ও সবলভাবে সমাজে বসবাসের অধিকার নিশ্চিত হয়। ভুলে কেউ কারো অঙ্গহানী করলে বা হত্যা করলে দিয়াত বা রক্তপনের বিধান রয়েছে। ইচ্ছাকৃত হত্যা করলে কিসাসের বা হত্যার বদলে হত্যার বিধান করা হয়েছে। জান ও মালের উপর হামলাকারীকে প্রতিহত করার বিধান রয়েছে। ইসলামের এ সকল বিধানাবলীকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যার একটি জনগোষ্ঠি মধ্যযুগীয় বর্বরতা বলে আখ্যায়িত করে এবং এ সকল বিধান বাদ দিয়ে মনগড়া আরামদায়ক শাস্তির বিধান করেছে। যার ফলে বর্তমান বিশ্বকে যদি খুন-খারাবীর দিক বিবেচনায় মূর্খতার যুগের সাথে তুলনা করা হয় তাহলে সরিষাদানা পরিমানও অবিচার হবে না। 

মানুষের জন্য একটি অতীব মূল্যবান অধিকার হচ্ছে ন্যায় বিচার লাভের অধিকার। ইসলামের দৃষ্টিতে বাদশাহ বা সাধারন প্রজা ধনী কিংবা ফকির কালো অথবা সাদা সকলেই সমান। অতীতের এমন বহু ঘটনা ইতিহাসের পাতায় স্বর্নাক্ষরে লিখা রয়েছে যে মুসলিম শাসিত অঞ্চলে বাদশাহর বা খলীফার বিরূদ্ধে একজন সাধারন প্রজাকতৃক আদালতে মামলা হয়েছে এবং বিচারকের রায় ঐ খলীফা বা বাদশাহর বিপক্ষে হয়েছে। বর্তমানে ইসলামী শরীয়াহ ব্যবস্থা মানুষের মাঝে প্রচলন না থাকার কারনে আদালত প্রাঙ্গন হয়ে উঠেছে শোষনের অন্যতম হাতিয়ার। আর এই আদালতের মারপ্যাঁচকে কেন্দ্র করেই সরকারি ও বে-সরকারি কর্মকর্তা ও দালালরা হয়ে উঠেছে একেকজন হিটলার। যেখানে জনসাধারন এক সময়ে নিজেদের মধ্যকার ঝামেলা মিটিয়ে শান্তিতে বসবাস করার নিমিত্তে আসত। সেখানে আজ জনসাধারনের নিজেদের মধ্যকার বিবাদের আগুনকে বাতাস সরবরাহ করে সমাজে, রাষ্ট্রে বিশৃঙখলা সৃষ্টি করছে। একসময় আদালতে শান্তিপ্রিয় মানুষেরা উৎসাহের সাথে পূর্ন বিশ্বাস ও ভক্তি নিয়ে বিচার পেশ করত। কিন্তু এখন অশান্তিপ্রিয়রা উৎসাহের সাথে আদালতে যায়। অথচ আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন “যখন তোমরা লোকদের মাঝে বিচার করবে তখন তোমরা ন্যায় বিচার করবে।” হাদিসে আছে, “বিচারক যেন রাগান্বিত অবস্থায় দুই ব্যক্তির মাঝে কোন বিষয়ে ফায়সালা না করে।” সুতরাং, সহজেই উপলব্ধ হয় যে, ইসলাম ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অন্যসব জীবন ব্যবস্থা থেকে অনেক এগিয়ে। 

এরপরে আছে মানুষের জীবন যাপনের অতিব প্রয়োজনীয় উপাদান অর্থসম্পদ। অর্থনৈতিক অধিকার বিষয়ে বিভিন্ন ধরণের ব্যবস্থপনা বিভিন্নভাবে বিভিন্নজনের হাতে বহু আকারে প্রনয়ন হয়েছে। এবং প্রতিনিয়ত হচ্ছে। পৃথিবীতে মানুষের খাদ্য চাহিদার থেকেও অনেক বেশী খাদ্য উৎপাদিত হচ্ছে প্রতিবছর। কিন্তু তবুও অসংখ্যা মানুষ না খেয়ে দিনাতিপাত করছে। কেউবা অর্ধাহারেই তুষ্ট থাকছে বাধ্য হয়ে। আবার কেউবা অনাহারে মারা যাচ্ছে বহু ধরণের মরনব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে। এর কারন হচ্ছে অর্থনৈতিক অধিকারের সঠিক বিধান সম্বলিত ব্যবস্থা অর্থাৎ ইসলামিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে দূরে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। যার ফলে অর্থনৈতিক বন্টন সুবিধাজনকভাবে হতে বাধাগ্রস্থ। এক্ষেত্রে ইসলাম মানুষের মধ্য থেকে লোভ-লালসাকে ত্যাগ করে ধনী-গরীব সকলের মধ্যে সমতা এবং পরষ্পরের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি করতে যাকাতের বিধান করেছে। ওশর ও খেরাজের বিধান করেছে। যাতে করে প্রতিটি মানুষ তার অর্থনৈতিক অধিকার ন্যায় সম্মতভাবে ভোগ করতে পারে। দান সদকার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। গরীবদের উপর বিশেষভাবে গরীব আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশীর উপর সম্পদ ব্যায়ের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যার ফলে সেই গরীব ব্যক্তি সচ্ছলতায় এসে যাবে। এবং অভাবের তাড়নায় পড়ে সে অবৈধপন্থা তথা চুরি, ডাকাতী, ছিনতাই ও অন্যান্য ঘৃনিত উপার্জনের থেকে বিরত থাকবে। এতে করে সম্পদশালীর সম্পদও নিরাপদ হয়ে যাবে। এছাড়াও যাকাত প্রদানের দ্বারা সমাজের মানুষের মধ্যে বিরাজমান অভাব দূরীভুত হবে। যার ফলে মানুষের একে অন্যের মাঝে ভালবাসা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরী হয়। এরপরেও যদি কেউ চুরি করে, ছিনতাই ও ডাকাতীতে লিপ্ত হয়। তবে তাদের জন্য কঠিন শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। যা দেখে অন্যারাও সর্তক হয়ে যায়। এবং সম্পদ নিরাপদ থাকে। অর্থনৈতিক অধিকারের বিধানাবলীর মধ্যে আরো বিধান রাখা হয়েছে। বাকপটুতার মাধ্যমে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করা যাবে না। বর্তমান বিশ্বে মানব সভ্যতা এমন পর্যায়ে পৌঁেছছে যে মানুষ অন্যের সম্পদ বাকপটুতার মাধ্যমে অন্যায়ভাবে হস্তগত করাকে খুব গর্বের বিষয় মনে করে থাকে। এবং যে এই ধরনের কাজ করে থাকে, তাকে মানব সমাজে বুদ্ধিমান বলে আখ্যায়িত করা হয়। অথচ এ ব্যাপারে আল্লাহর রাসুলের কড়া নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কেননা এর দ্বারা সমাজ থেকে শান্তি উঠে যায় এবং মানুষে মানুষে কোন্দল সৃষ্টি হয়। ইসলামি অর্থনীতিতে সুদকে হারাম করা হয়েছে। এবং সুদের সকল পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সুদ একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি। একটি পরিবার, জাতি ও রাষ্ট্র ধ্বংসের মোক্ষম অস্ত্র হচ্ছে সুদ। পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট ভাষায় সুদকে হারাম ঘোষনা করা হয়েছে। মানুষকে সুদের ব্যাপারে নিরূৎসাহিত করতে অনেক আযাবের কথা বলে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। বর্তমান সময়ে আমরা যদি সুদের ব্যাপারটি বিশ্লেষণ করে দেখি তাহলে সহজেই অনুমান করতে পারি যে, সুদ সমাজের সকল স্তরের মানুষের অধিকার খর্ব করার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়াও ইসলাম মানুষের মৃত্যুর পরে ওয়ারিশদের মধ্যে সম্পত্তি ন্যায়সম্মতভাবে বন্টনের বিধান জারি করেছে। এবং এ ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন না করার আদেশ দিয়েছে। বর্তমান সমাজে কেউ মারা গেলে তার ওয়ারিশদের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি হয়ে যায় মৃত ব্যক্তির ত্যাজ্যকৃত সম্পত্তি বন্টন নিয়ে। অধিকাংশ সময় দেখা যায় যে, মৃত ব্যক্তি সৎকার করার টাকা কেউ দিতে চায় না। ফলে একজন ব্যক্তি জীবনের অবসান হওয়ার পরও অবহেলিত অবস্থায় থাকে। কিন্ত ইসলাম মৃতের সম্পত্তি বন্টনের পূর্বে তার ছেড়ে যাওয়া অর্থ থেকে তার সৎকারের ব্যবস্থা করার আদেশ দিয়েছে। এবং ওয়ারিশদের মাঝে ভ্রাতৃত্বের ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক রাখতে সম্পত্তির কতটুকু অংশ কে পাবে তা ন্যায়সম্মতভাবে কড়ায়-গন্ডায় আদায় করার বিধান ও আদেশ দিয়েছে স্পষ্ট ভাষায়। এবং এক্ষেত্রে ইসলাম ছোট, বোকা-জ্ঞানহীন এবং খেয়ানতকারীর হাতে মাল অর্পন করতে নিষেধাজ্ঞা জারী করেছে। যাতে করে তারা অপচয়ের মাধ্যমে মাল নষ্ট করতে না পারে।

এই মানবাধিকারেরই একটি অন্যতম বিষয় হচ্ছে নারীর অধিকার। বিশেষভাবে বিবেচিত। যদি মানবজাতির মধ্যে নারীর অধিকার যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত না হয় তাহলে মানবসমাজ অচল। মানবাধিকার অচল। পৃথিবীতে একটা সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে যখন মানব সমাজে নারীকে গন্য করা হতো না। কারো কন্যাসন্তান হলে সেই কন্যাসন্তানকে জীবিত মাটিতে পুঁতে ফেলা হতো। নারীকে মনে করা হতো যৌনভোগ সামগ্রী। ইসলামই সর্বপ্রথম নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। এমনকি নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে মুসলিমদের জীবন বিধান কুরআন শরীফে সুরা নিসা নামে একটি সুরা রাখা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, নিসা শব্দটির অর্থ আসে মহিলাগন। উক্ত সুরার মাধ্যমে নারীর সম্মান, অধিকার নিয়ে বিভিন্ন বিধান জানানো হয়। নারীর অধিকার ঘোষনা করতে গিয়ে কুরআনে বলা হয়েছে যে, তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের জন্য পরিধেয় আর তোমরা তাদের জন্য পরিধেয়। উক্ত পবিত্র বানীর মাধ্যমে উপলব্ধ হয় যে, ইসলাম পুরুষকে যতটুকু অধিকার দিয়েছে ঠিক নারীকেও ততটুকু অধিকার দিয়েছে। নারীকে করা হয়েছে সম্মানিত। এবং তার জন্য যে গুরুদায়িত্ব ইসলাম নির্ধারণ করেছে তাও সম্মানিত। পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত যত বড় মণীষি এসেছেন তাঁদের সকলেরই বড় হয়ে ওঠার পিছনে হয়তো তাঁর মায়ের নয়তো তাঁর বোনের অথবা তাঁর স্ত্রী-কন্যার ভূমিকা ছিল এবং আছে। ইসলাম একজন নারীকে সম্মান বা স্নেহ দিয়েছে মেয়েরূপে, বোন বিবেচনায়, খালা-ফুফুরূপে, স্ত্রীরূপে, মা, দাদী-নানীরূপে। পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা বা উন্নতি সাধনের লক্ষ্যে কাজ করে পুরুষ জাতি। আর সেই পুরুষকে সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলে নারী। কেমন যেন সমগ্র পৃথিবীই আজ পর্যন্ত যতটা উন্নতির সোপানে পৌছেছে তার পিছনে নারীর ভূমিকাই মূখ্য। বর্তমান সময়ের পাশ্চাত্য জাতি যারা মূর্খতার যুগের অজ্ঞতার গভীরে থাকা মানবসমূহের উত্তরসুরীরূপে বিবেচিত তারা তাদের পূর্বপুরুষদের অনুসরনে নারী জাতিকে পরিপুর্নরূপে ভোগ-বিলাসের পাত্র বানাতে ইসলামের সঠিক জ্ঞান থেকে দূরে সরিয়ে ফেলেছে। এই নারী একসময় দুনিয়াজুড়ে কালজয়ী সেনানায়ক, ন্যায়বিচারক, বাদশাহ, জ্ঞানী, কবি, সাহিত্যিক উপহার দিয়েছে। আজ এই নারী পৃথিবীভরে নিজেকে পন্য বানিয়ে নিজেদের পেটে ধরা পুরুষের লোলুপ দৃষ্টির খোরাক হয়েছে। এসবই পাশ্চাত্য জীবনধারার অনুসরন ও ইসলামি শরীয়াহ থেকে বিচ্যুতির ফলাফল। বর্তমান সময়ে প্রতিদিন পত্র-পত্রিকায় কমপক্ষে একটা ধর্ষন বা যৌতুক সম্পর্কিত খবর থাকবেই। এহেন নাজুক পরিস্থিতি তৈরী হওয়ার পিছনে মূল কারন ইসলামি বিধানের অবজ্ঞা ও পাশ্চাত্যের অনুসরন। তবুও মানুষ কেন যেন সেই সোনালী দিনগুলোতে ফিরে যেতে চায় না। আবার ইসলামকেই উল্টো দোষ চাপিয়ে দেয়। কেমন যেন সাপের কবল থেকে বাঁচানো বেজিকেই হত্যা করা এবং সাপের সানিধ্য ফিরে যাওয়া। একজন নারীর সর্বাবস্থায় ইসলাম যে অধিকার দিয়েছে তা যদি নিরপেক্ষ বিচারে ধরা হয় তাহলে দুনিয়ার অন্য সকল নীতিমালা বানের স্রোতে খড়কুঠোর ন্যায় ভেসে যাবে। দুনিয়াতে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা পরিপূর্নরূপ পাবে যখন পিতা-মাতার অধিকার পুরোপুরিভাবে আদায় করা হবে। এই একটা ক্ষেত্রে পৃথিবীর অন্যান্য জীবন বিধান শিশুমাত্র। কারন হচ্ছে কোথাও কোন বিচারে বা কোন আইনে পিতা-মাতার অধিকার আদায়ের কথা জোড়দারভাবে বলা হয়নি। পিতা-মাতার অধিকার সংরক্ষনে ইসলাম অনন্য ভূমিকা রেখেছে। তাইতো সন্তানদেরকে পিতা-মাতার আদেশ নিষেধ পালন করা ও তাদের সাথে সর্বদা সদাচারণ করার নির্দেশ দিয়ে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে “আমি মানুষদেরকে তাদের পিতা-মাতার সাথে সদাচারণের নির্দেশ দিয়েছি।” মহান আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতার অধিকারকে এতই গুরুত্বের সাথে পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন যে, সন্তানদেরকে সর্বদা তাদের আনুগত্য করতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং পিতা-মাতা শিরক ও কুফরের উপর আদেশ দেয়া বা বাধ্য করার আগ পর্যন্ত সন্তানদেরকে অম্লান বদনে তাঁদের আদেশ নিষেধ মেনে চলতে বলেছেন। এমনকি যদি তাঁরা কখনও শিরক ও কুফরের উপর বাধ্য করে তাহলে তখন তাঁদের কথা মানা যাবে না ঠিকই, কিন্ত তদুপরি তখনও তাঁদের সাথে খারাপ বা অসৎ আচরন করা যাবে না। বরং তখনও তাঁদের সাথে সদ্ব্যবহার বজায় রাখতে হবে। অপরদিকে বর্তমান পাশ্চাত্য সম্রাজ্যগুলোতে পিতা-মাতার অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি অনন্য নজির হচ্ছে, যদি পিতা-মাতার মধ্য থেকে যেকোন একজন সন্তানকে কোন অন্যায়ের কারনে অথবা অন্যায় থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে প্রহার বা বকাঝকা করে তবে সন্তান পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে পারবে। এবং সন্তান পুলিশে অভিযোগ করতে দেরী হতে পারে পিতা-মাতার হাজতে যাওয়া বিলম্বিত হয় না। এই যদি হয় আমাকে মানবরূপে দুনিয়ায় আনয়নকারী পিতা-মাতার অধিকার আদায়। তবে ঐ জীবন ব্যবস্থা দ্বারা আমি মানবের অধিকার কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে তা সহজেই অনুমেয়। অথচ পিতা-মাতার গুরুত্ব ও উচ্চ মর্যাদার কথা বোঝাতে গিয়ে আমাদের বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন “নিশ্চয়ই জান্নাতের দরজাসমূহ পিতা-মাতার পদতলে।” 
মানুষ জন্মগতভাবেই সামাজিক জীব। আশেপাশের বসবাসকারী প্রতিবেশী ও নিকটাত্মীয়দের অধিকার আবশ্যকীয়ভাবেই প্রত্যেকের উপর বর্তায়। এ অধিকার সম্পর্কে মানুষ অনেকটাই অজ্ঞ। বর্তমান প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা অনুযায়ী এ বিষয়ের উপর খুব কমই গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কিন্তু ইসলাম প্রতিবেশী ও নিকটাত্মীয়ের সাথে সৎব্যবহার করার আদেশ পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট ভাষায় দিয়েছে। বলা হয়েছে, “তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর, তার সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না। আর সদ্ব্যবহার কর মাতা-পিতার সাথে, নিকটাত্মীয়ের সাথে, প্রতিবেশীর সাথে,....।” এখানে লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে আল্লাহ যেখানে তার একত্ববাদের এবং তার ইবাদাতের কথা বলছেন সেখানেই নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে বিধান দিচ্ছেন। এর দ্বারা উপলব্ধ হয় যে নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশীর অধিকারের উপর ইসলাম কতটা জোর দিয়েছে। এবং এই বিষয়টা এমন যে মানুষের শান্তি ও শৃঙ্খলার সাথে সমাজে বসবাস করতে প্রধান উপাদান হিসেবে নিলে ভুল হবে না। এবং এ বিষয়ে মুসলিমদেরকেই বেশী জোড়দারভাবে বলা হয়েছে। যেমন বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার শেকড় সর্বকালের মহামানব হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “সেই ব্যক্তি প্রকৃত মুমিন নয় যে পেটভরে আহার করে অথচ তার প্রতিবেশী অনাহারে থাকে।” অর্থাৎ, প্রতিবেশী বা নিকটাত্মীয় যদি গরীব হয় আর তারা অনাহারে দিনাতিপাত করে থাকে, তবে প্রয়োজনে নিজে অর্ধাহারে কাটিয়ে হলেও তাদের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। এর ফলে সমাজে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি হবে এবং এর দ্বারা বিশ্বে শান্তি ও ভালবাসার জোয়ার বয়ে যাবে। 
এরপরে মানুষের জীবনের মৌলিক অধিকার তথা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার অধিকার। এগুলোর উপর ভিত্তি করেই মূলত অন্য সকল অধিকারের বিধান করা হয়েছে। মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে অন্যতম তিনটি বিষয় হচ্ছে অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থান। যেকোনো মানুষের জীবন ধারনের জন্য এগুলো হচ্ছে অপরিহার্য। এ ব্যাপারে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “ক্ষুধা মেটানোর জন্য রুটি ও পানিয়, আব্রু ঢাকার জন্য একটি কাপড় এবং বাস করার মতো একটি গৃহ - এর থেকে অধিকতর জরুরী আর কোন অধিকার আদম সন্তানের থাকতে পারে না।” উক্ত তিনটি অধিকারের পরেই বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় শিক্ষা ও চিকিৎসার অধিকার। মানব জীবনের এই সকল অধিকার বাস্তবায়নের জন্যে প্রথমত ইসলাম মুসলমানদেরকে হালাল পন্থায় জীবিকা অন্বেষণের নির্দেশ দিয়েছে। এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আদেশ করা হয়েছে এ ব্যাপারে হাদিসেও প্রায় একই কথা পাওয়া যায়। 
এ সকল বিষয়ের উপর বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, দুনিয়ার সকল জীবন বিধানগুলোকে একত্রিত করে এক পাল্লায় রেখে অপর পাল্লায় যদি ইসলামকে রাখা হয় তবে ইসলামের পাল্লা ভারি হয়ে যাবে। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মানুষের জন্ম ও বেচে থাকার, নিরাপত্তার, ন্যায় বিচার লাভের, অর্থনৈতিক, নারীর, পিতা-মাতার, নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশীর এককথায় মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো আদায়ে ইসলাম অনন্য ও অদ্বিতীয়। সুতরাং, প্রতিটি জ্ঞানসম্পন্ন মানুষই একথা নিদির্¦ধায় স্বীকার করতে বাধ্য যে একমাত্র ইসলামই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় পরিপুর্নতা পেয়েছে।






তাং-২৪ই নভেম্বর ২০১৭ইং


                                                                                                                          - রচনায়
                               মুহাম্মাদ ওবাইদুল্লাহ

0 comments:

Post a Comment