সকল প্রশংসা আল্লাহ তা’আলার জন্য করি। কেননা, তিনি আমাদের মানবজাতিকে সামাজিক জীবরূপে সৃষ্টি করেছেন। দুনিয়াতে আল্লাহ হাজারো জীব সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু একমাত্র মানুষকেই সামাজিকভাবে বসবাস করার জ্ঞান এবং বসবাসের উপকরন দিয়েছেন। মানুষকে তিনি সমাজে শৃংখলা বজায় রেখে বসবাস করতে উন্নত শিক্ষা-সংস্কৃতি দিয়েছেন নবী-রাসুল প্রেরনের মাধ্যমে। এ ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন, “আমি প্রত্যেক রাসুলকেই তার স্বজাতির ভাষাতেই প্রেরন করেছি, যাতে সে তাদের কাছে বর্ননা দেয়।”(সুরা ইবরাহিম-৪)
সুতরাং, কুরআনের এই এশী বানীর দ্বারা একটা বিষয় তা পরিস্কার বুঝে আসে যে, নবী রাসুলগণ মানুষের সমাজে শান্তিতে বসবাসের জন্য শিক্ষা-সংস্কৃতি নিয়ে এসেছেন। মানুষ যদি সমাজে শান্তি বজায় রাখতে চায় তাহলে নিজেদের মধ্যে নৈতিকতার চর্চা পরিপূর্নভাবে রাখতে হবে। আর নৈতিকতা সঠিক ও শুদ্ধভাবে ব্যবহার করতে হলে দরকার সঠিক শিক্ষা-সংস্কৃতি। শিক্ষা-সংস্কৃতির ব্যবহার ও অপব্যবহার দুটোই পৃথীবিজুড়ে সমাদৃত। তবে তুলনামূলকভাবে অপব্যবহারই বেশী হয়ে থাকে। এবং পৃথীবিজোড়া বর্তমানে শিক্ষা-সংস্কৃতির সঠিক প্রয়োগ হয় একমাত্র ইসলামি শিক্ষা-সংস্কৃতির দ্বারা। এই ইসলামী শিক্ষা-সংস্কৃতি পাওয়ার নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হচ্ছে মাদ্রাসা।

বিট্রিশ বেনিয়ারা যখন উপমহাদেশ দখল করে নেয়, তখন নিজেদের রাজত্ব স্থায়ী করতে তারা এ অঞ্চলের মানুষকে মেধাশুন্য করার চিন্তা করে। এ লক্ষ্যে তারা মানুষের শিক্ষার অধিকার ছিনিয়ে নেয়। যাতে করে জাতি নৈতিকতা হারিয়ে স্বাধীনতা ভুলে গোলামীর শিকলে আবদ্ধ হয়। জাতির এহেন নাজুক পরিস্থিতিতে সমকালীন কয়েকজন সচেতন ধর্মপরায়ন ব্যাক্তিবর্গ মিলে আল্লাহর উপর ভরসা ও পূর্নবিশ্বাসকে পুজি করে অদম্য সাহসীকতার সাথে উপমহাদেশের মুসলিমদের সঠিক নৈতিকতার শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্যে ইসলামী শিক্ষা-সংস্কৃতি সংকলিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করেন। এই ইসলামী শিক্ষা-সংস্কৃতি সম্বলিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই পরে মাদ্রাসা নামে পরিচিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতাগণের যারা আলেম ছিলেন, তারা এই মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতির সিলেবাস প্রস্তুত করেন। এ সিলেবাস প্রনয়নে তারা লক্ষ্য রেখেছেন যে, এ সিলেবাসের আওতায় পড়াশোনা শেষ করার দ্বারা একজন শিক্ষার্থী কুরআন ও হাদীসের অগাধ জ্ঞানার্জনের পাশাপাশী স্বদেশকে শত্রুমুক্ত করার যোগ্যতা রাখবে। এরই সাথে সমাজ সংস্কারক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে। আবার আদব-শিষ্টাচার বা ভদ্রতার ক্ষেত্রেও হবে স্বার্থহীন। এবং এই সিলেবাস প্রস্তুতকারকবৃন্দ শুধু সিলেবাস প্রনয়নেই ক্ষ্যন্ত হননি। বরং, এ সিলেবাসের শিক্ষার্থী যেন তার শিক্ষাকে সঠিক ক্ষেত্রে এবং দেশ ও জাতির কল্যানে ব্যবহার করে তার জন্য আলাদাভাবে খেয়াল রেখেছেন।
মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতির ঐতিহ্য ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখা রয়েছে। সর্বপ্রথম যেই মাদ্রাসার ইতিহাস আমরা ইতিহাস গ্রন্থসমূহ থেকে পেয়ে থাকি সেই মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি এমন একজন শিক্ষক ছিলেন, যিনি একমাত্র আল্লাহর কাছ থেকেই জ্ঞানার্জন করতেন এবং সেই মাদ্রাসার কোন আলাদা আইন কানুন ছিল না। ছিল না কোন নির্দিষ্ট ক্লাসরুম। তবুও সেই মাদ্রাসার ছাত্ররাই দুনিয়াব্যাপী এক আল্লাহর একত্ববাদ ও রাসুলের শিক্ষা, মানবতার মুক্তির আহবান নিয়ে ছড়িয়েছেন। এই মাদ্রাসা ছিল রাসুলের নিজ শহর মদীনায়। এরপর, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের চতুর্থ খলীফা হযরত আলী (রাযি.) তার খিলাফতকার্য পরিচালনার কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেন ইরাকের কুফা নগরীকে। এরই মাধ্যমে ইসলামী শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারের আরেকটি কেন্দ্র হয়ে ওঠে ইরাক। এই দুই কেন্দ্র থেকে মূলত মাদ্রাসা শিক্ষার হাতে খড়ি। নিয়মতান্ত্রিক মাদ্রাসার প্রচলন হয় সর্বপ্রথম বাগদাদের মাদ্রাসায়ে নিজামীয়া থেকে। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রচলিত সিলেবাসকে দরসে নিজামী বলা হয়ে থাকে। এরপর আমাদের উপমহাদেশে ইংরেজ শাসন চলাকালীন সময়ে যখন একের পর এক আন্দোলন অসফল প্রমানিত হচ্ছিল, তখন মানুষ হতাশার গহিনে ডুবে গিয়েছিল। তৎকালীন সময়ে অদৃশ্য ইশারার ভিত্তিতে কয়েকজনের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সুচিন্তার ফসল হিসেবে দিল্লিতে প্রথম মাদ্রাসাটির পথচলা শুরু হয়। ধীরে ধীরে মুসলিমরা এই শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি ঝুকে পড়ে। এরই জেড় ধরে উপমহাদেশ স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত আবার মজবুত হতে শুরু করে। একসময় যখন ইংরেজরা নিজেদের অদূর ভবিষ্যত অন্ধকার দেখতে পায়। তখন তারা এর শিকড়ের সন্ধানে লেগে যায়। এবং যখন এই মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারে, তখন মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতিকে বিলীন করতে নানামুখী অপচেষ্টা চালিয়ে যায়। কিন্তু একের পর এক ব্যর্থতার গ্লানি তাদেরকে বরন করে নিতে হয়। এরপর তারা নিজেদের সুক্ষ বিশ্লেষণকে কাজে লাগিয়ে এই অঞ্চলে মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতির বিপরীতমুখী চিন্তা-চেতনার বীজ মানুষের মনে বপন করে দিয়ে যায়। মানুষকে ধারণা দেওয়া হয় যে, এই শিক্ষা-সংস্কৃতির মধ্যে কোন লাভ নেই। অর্থ উপার্জনের উপকরন হিসেবে গ্রহন করার পর্যায়ে পর্যাপ্ত পার্থিব জ্ঞান আহরনের ব্যবস্থা এ শিক্ষা ধারায় নেই। সুতরাং, এ শিক্ষা-সংস্কৃতি নিছক অথর্ব। এখানে লক্ষনীয় বিষয় হলো মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতি মূল উদ্দেশ্য নৈতিক উৎকর্ষ লাভ। আর তা পরিপূর্নভাবেই অর্জিত হয়। এবং এ শিক্ষা-সংস্কৃতি অর্জনের দ্বারা রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, পারিবারিক ও ব্যক্তিক জীবন সুশীল ও পরিমার্জিত হয়। এ শিক্ষা-সংস্কৃতি অর্জনের দ্বারা মনুষ্যত্ব ও নৈতিকতার বিকাশ ঘটে। তবে এ শিক্ষা-সংস্কৃতির দ্বারা যে কোন উপার্জনই করা যায় না, তা নয়। বরং, উচ্চ অর্থবিত্ত অর্জনের জন্য পৃথক শিক্ষা রয়েছে। কিন্তু, তাতে নৈতিকতার শিক্ষা খুব কমই পাওয়া যায়। মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতির ধারক বাহকরা যেহেতু পরিপূর্ন আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে তার হুকুমসমূহ বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নেয়, তাই তারা উপার্জনের বিষয়টি আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়েছে। কেননা, আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, “আমিই তোমাদের এবং তোমাদের সন্তানদেরকে রিযিক দিয়ে থাকি।” (সুরা হুদ-৬)

মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রসার শুধু উপমহাদেশেই নয়। বরং, এ শিক্ষা-সংস্কৃতি পুরো এশিয়াজুড়ে এবং এর বাহিরে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা ও আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। আমাদের বাংলাদেশে এ ধারার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বর্তমানে প্রায় পাচ হাজারেরও অধিক রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ের মক্তব রয়েছে প্রায় ষাট হাজারেরও অধিক। এসব মাদ্রাসা ও মক্তবগুলোতে শিক্ষার্থীদের যে নৈতিকতার শিক্ষা-সংস্কৃতির চর্চা করানো হয় তা পুজি করেই এখনও বাংলাদেশের শান্তি ও শৃংখলার অবস্থান মোটামুটি ভালোই আছে। সব মিলিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতির ঐতিহ্য আমাদের ব্যাক্তিগত জীবনের পাশাপাশি পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় জীবনে বহু তাৎপর্যপূর্ন।
মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতির ঐতিহ্যের পাশাপাশি এর অবদানও অনেক বেশী প্রভাব রাখে আমাদের জীবন ব্যবস্থাপনায়। এর অন্যতম কারন হচ্ছে, মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতির মূল ভিত্তিই হচ্ছে কুরআন ও হাদীস। এবং এ শিক্ষার উদ্দেশ্যই হচ্ছে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তিত জীবন ব্যবস্থাকে সঠিকভাবে জানা এবং তার প্রচারের প্রসার ঘটানো। আর ইসলাম সম্পর্কে আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন, “আল্লাহর কাছে একমাত্র গ্রহনযোগ্য জীবন ব্যবস্থা হলো ইসলাম।” (সুরা আলে ইমরান-১৯)
অনেক বিজ্ঞজনদের মতে ইসলামই হচ্ছে একমাত্র পূর্নাঙ্গ জীবন বিধান। সুতরাং, এ বিষয়গুলোকে সামনে রেখে যদি মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতির অবদান আমাদের বাস্তব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মিলিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করি, তবে তার ইতিবাচক বৈ নেতিবাচক কিছুই পাওয়া যাবে না।
এমন হাজারো বিষয়ের মধ্যে থেকে যদি আমরা মানবাধিকারকে বেছে নেই এবং বিশ্লেষণ করি যে, মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতির এই বিষয়ের উপর অবদান কতটুকু, তবে আমরা দেখতে পাই যে, মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতি মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রতিনিয়ত সোচ্চার ভুমিকা রাখছে। প্রতি বছরেই একটা নির্দিষ্ট সময়ে মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিতরা মানুষদেরকে যাকাত দেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করে থাকে। আর যাকাত এমন একটা উপকারী বিষয়ে যা সমাজের সকল শ্রেনীর মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থাকে উন্নত করতে একমাত্র বৈধ পন্থা। যখন মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নতি সাধন করবে তখন খাদ্যের জোগান আল্লাহর ইচ্ছায় সহজ হয়ে যায়। দুমুঠো ভাতের জন্য আর দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ানোর প্রয়োজন থাকে না। এর সাথে মানব জীবনের আরেকটি বিষয় যোগ করে নিতে হয়, কাপড় বা পরিধেয় বস্ত্র প্রয়োজনমাফিক থাকা। আবার বাসস্থানের প্রয়োজন সবচেয়ে আগেই চলে আসে। এরপরে মানব জীবনের মৌলিক অধিকারের মধ্যে গণ্য করা হয় শিক্ষাকে। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায়ই ধনী-গরিব, সাদা-কালো ইত্যাদি জাতি, বর্ন নির্বিশেষে সকল শ্রেনীর মানুষই গ্রহন করতে পারে। মাদ্রাসা শিক্ষার অর্জনের পাশাপাশী যারা চিকিৎসাবিদ্যা অর্জন করে থাকে তারা অন্যসব চিকিৎসক থেকে একটু পৃথক হয়ে থাকে। অন্য দশজনের মতো আগে টাকা পরে চিকিৎসা সুত্রে বিশ্বাসী থাকে না। এই মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতির অবদান আরেকভাবে অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে। মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতির চর্চায় বেড়ে ওঠা একজন শিক্ষার্থী কখনো ব্যবসায়ীরূপে খাদ্য গুদামজাত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরী করে না বা করবে না। সে কখনো তাকে পেটে ধারন করা মায়ের জাতির শরীর থেকে প্রকাশ্য বস্ত্র হরনের পৈশাচিক বিনোদনে মত্ত হবে না। সে কখনো টাকার এবং ক্ষমতার দাপটকে কাজে লাগিয়ে নিরীহ মানুষের জায়গা দখল করে মানুষকে ঘরছাড়া করে না। মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতির চর্চা করা শিক্ষার্থী নিজের শিক্ষাকে অপরের নিকট বিলিয়ে দিতে টাকার হিসেব করে না। মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতির অঙ্গনই বর্তমানে একমাত্র দুর্নীতি ও অপরাজনীতি মুক্ত শিক্ষাঙ্গন বললে ভুল হবে না। মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতি পাওয়া ব্যাক্তি চিকিৎসাবিদ্যা অর্জন করলেও কখনো বৈধ ডাকাতির চিন্তা করে না। মানুষের মাঝে যদি এই মৌলিক অধিকারগুলোর যথাযথ আদায়ের সুচিন্তা বিরাজ করার মতো কোনো শিক্ষা-সংস্কৃতি থাকে, তাহলে তা একমাত্র মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতি।
এ বিষয়ের উপর যদি আরেকটু গভিরে চিন্তা করা হয় তাহলে দেখা যায় যে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতির অবদান অন্যান্য শিক্ষা ব্যবস্থাগুলোর তুলনায় অনেক বেশী মাত্রায় প্রশংসনীয় মাদ্রাসা পড়–য়ার মা-বোন কিংবা স্ত্রী-কন্যার কখনো নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার শ্লোগান নিয়ে রাস্তায় মিছিল করতে হয় না। কখনো ইজ্জতের বলী দিয়ে অধিকার আদায়ের আন্দোলন করার প্রয়োজন হয় না। একজন মাদ্রাসা পড়–য়া তার পড়াশোনা থাকে শুধুই কুরআন ও হাদীস অনুসরনের উদ্দেশ্য। আর পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, “তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের জন্য পরিধেয় আর তোমরা তাদের জন্য পরিধেয়।” (সুরা বাকারা-১৭৬)
এই ঐশী বিধানের মাধ্যমে উপলব্ধ হয় যে, ইসলাম নারীকে করেছে সম্মানিত। অতএব, বিজ্ঞান নিয়ে পড়া শিক্ষার্থী যেমনিভাবে বিজ্ঞান মানবে, ব্যবসায় নিয়ে পড়া শিক্ষার্থী যেমনিভাবে ব্যবসা করবে। ঠিক তেমনি ইসলাম নিয়ে পড়া বা কুরআন ও হাদীস পড়া শিক্ষার্থী কুরআন ও হাদীসের আদেশ নিষেধ মানবে, এটাই স্বাভাবিক। মাদ্রাসা পড়ুয়া একথা জানে যে, পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত যত বড় মনীষি এসেছেন তাদের সকলেরই বড় হয়ে ওঠার পিছনে হয়তো তার মায়ের নয়তো তার বোনের অথবা তার স্ত্রী-কন্যার ভুমিকা ছিল এবং আছে। সুতরাং, নারীকে লোলুপ দৃষ্টির খোরাক নয়, বরং সম্মানের পাত্র হিসেবে নিতে হবে। মাদ্রাসা পড়–য়া জানে যে, ইসলাম একজন নারীকে তার নিকটে সম্মান বা ¯েœহ দিয়েছে কখনো মেয়ে হিসেবে, বোন বিবেচনায় অথবা খালা-ফুফুর দৃষ্টিতে কখনো স্ত্রী বা মায়ের আসনে আবার কখনো দাদী-নানীরূপে। নারী এ পর্যন্ত পৃথিবীকে উপহার দিয়েছে কালজয়ী সেনানায়ক, দূর্বার সিপাহসালার, ন্যায় বিচারক, দূরদর্শি বাদশাহ, মহাজ্ঞানী, কবি, সাহিত্যিক ও যুগশ্রেষ্ট আলেম এবং গাউস-কুতুব। সুতরাং, এই নারী কখনো আমার হাতে লাঞ্চনার শিকার হতে পারে না। এইভাবে নারীর অধিকার ও সম্মান আদায়ে মাদ্রাসা পড়–য়া তার শিক্ষা-সংস্কৃতির ঐতিহ্য ও অবদানের স্বাক্ষী যুগের পর যুগ ধরে অক্ষুন্ন রেখেছে।
মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতি বাজিমাত করেছে পিতা-মাতার হক্ব বা অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে। শুধু মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া অন্য কোন শিক্ষা ব্যবস্থায় পিতা-মাতার অধিকার আদায়ের কথা জোড়দারভাবে শিক্ষা দেওয়া হয় না। অথচ পবিত্র কুরআনে আল্ল্হা তা’আলা বলেন, “আমি মানুষদেরকে তাদের পিতা-মাতার সাথে সদাচরনের নির্দেশ দিয়েছি।” (সুরা আহক্বাফ-১৫) মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতির চর্চায় মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে শিখানো হয় যে, মহান আল্লাহ সন্তানদেরকে সর্বদা পিতা-মাতার আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং পিতা-মাতা শিরক ও কুফরের উপর আদেশ দেয়া বাধ্য করার আগ পর্যন্ত সন্তানদেরকে অম্লান বদনে তাদের আদেশ মেনে চলতে বলেছেন। এমনকি যদি তারা কখনও শিরক ও কুফরের উপর বাধ্য করে তাহলে তখন তাদের কথা মানা যাবে না ঠিকই, কিন্তু তদুপরি তখনও তাদের সাথে খারাপ বা অসৌজন্যমূলক আচরন করা যাবে না। বরং, তখনও তাদের সাথে সদ্ব্যবহার বজায় রাখতে হবে। আমরা যদি মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতির বিপরীতে পাশ্চাত্য শিক্ষা-সংস্কৃতির দিকে দৃষ্টি দেই, তবে আমরা সেখানে এমন এক শিক্ষা দেখতে পাই যেই শিক্ষার মাধ্যমে প্রচুর অর্থ উপার্জনের রাস্তা পাওয়া যায়। মাদ্রাসা বা ইসলামী শিক্ষার বিপরীতমুখী এসব শিক্ষা ব্যবস্থাগুলোতে দেখা যায় যে, পিতা-মাতা যদি সন্তানকে অন্যায় থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্য প্রহার বা বকাঝকার আশ্রয় গ্রহন করে, তবে সন্তান পুলিশের আশ্রয় গ্রহন করে পিতা-মাতার বিরূদ্ধে। পক্ষান্তরে, মাদ্রাসা পড়–য়া তার শিক্ষার থেকে পাওয়া নৈতিকতাকে কাজে লাগায়। সে তার পিতা-মাতার আনুগত্য করে, তাদের আদেশ ও নিষেধ মেনে চলে, তাদের প্রহার বা বকাঝকা স্বাভাবিকভাবেই মেনে নেয়। এবং পিতা-মাতা বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হলে সর্বদা তাদের সুযোগ সুবিধার প্রতি লক্ষ্য রাখে, তাদের ভরণ-পোষণ নিজের কাধে তুলে নেয়।
আর অন্যান্য বিষয়গুলোর ন্যয় এই ক্ষেত্রেও মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতির অবদান উল্লেখযোগ্য বলে বিবেচিত। এমনি একটি বিষয় হলো প্রতিবেশী ও নিকটাত্মীয়দের অধিকার। সমাজে সকলের সাথে মিলে মিশে চলতে পারলেই সামাজিক বলে গণ্য করা হয়ে থাকে। আর সমাজে সর্ব শ্রেণীর মানুষের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যম হচ্ছে প্রতিবেশী ও নিকটাত্মীয়দের সাথে তাদের অধিকার আদায়ের মাধ্যমে এক গভির ভালবাসার বন্ধন সৃষ্টি করা। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে এ বিষয়ে বলেন, “তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর, তার সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না। আর সদ্ব্যবহার কর পিতা-মাতা, নিকটাত্মীয়, প্রতিবেশীর সাথে,....।” (সুরা নিসা-৩৬) এখানে লক্ষনীয় বিষয় হচ্ছে যে, যেখানে আল্লাহ নিজের একত্ববাদ এবং তার ইবাদাতের আদেশ দিচ্ছেন, সেখানেই আবার তিনি পিতা-মাতার পরে নিকটাত্মীয়, প্রতিবেশীর অধিকার আদায় সম্পর্কে বিধান দিচ্ছেন। এর ব্যাখ্যায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বানীসমূহ থেকে পাওয়া যায় যে, মুমিন ব্যাক্তির প্রতিবেশী অনাহারে দিনাতিপাত করবে তা হতে পারবে না। এই শিক্ষা শুধুমাত্র মাদ্রাসা শিক্ষায় পাওয়া যায়। আর মাদ্রাসা পড়–য়া তার শিক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাবনত হয়েই সে তার প্রতিবেশী ও নিকটাত্মীয়দের অধিকার আদায়ে পূর্নমাত্রায় সতর্ক ও সোচ্চার থাকে। এতে করে মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতি সমাজে মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি করতে এক অবর্ননীয় অবদান যুগের পর যুগ ধরে প্রতিষ্ঠা করে আসছে।

এরপরে মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতি অশ্লীলতামুক্ত, সুখী ও স্বাবলম্বী সমাজ গঠনে এবং সমাজ সংস্কারক তৈরীতে বিশেষ অবদান রাখে এ বিষয়টিও নিশ্চিত হওয়া যায়, এ সকল বিষয়ে তাদের কর্মপদক্ষেপ বিবেচনা করে। মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতি সহশিক্ষাকে সমর্থন করে না আল্লাহর বিধান পালনার্থে। তাই মাদ্রাসা শিক্ষাকে সেকেলে বা বর্বরযুগীয় বৈষম্যপূর্ন শিক্ষা-সংস্কৃতি বলে চালিয়ে দেওয়ার একটা প্রবনতা সমাজের কিছু সুযোগ সন্ধানী বখাটের কাছ থেকে শোনা যায়। অথচ, আজকের আধুনিক পৃথিবীর সহশিক্ষার ফলাফল হিসেবে আমরা প্রায় প্রতিদিনের জাতিয় দৈনিকের পাতা ওল্টালেই একটা সহপাঠী কতৃক ধর্ষন বা যৌন হয়রানির সংবাদ স্বাভাবিকভাবেই পেয়ে যাই। কেমন যেন এই খবরটা না থাকলে মনে হয় গতকাল বোধহয় প্রতিবেদকের ছুটি ছিল। এমন নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এই সহশিক্ষার কারনে। এছাড়াও মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতি একজন শিক্ষার্থীকে অশ্লীলতামুক্ত সমাজ, রাষ্ট্র গঠনে উৎসাহিত করে থাকে। কেননা, যুবক বা তরুন সমাজ হচ্ছে রাষ্ট্র বা সমাজের জন্য অমূল্য সম্পদ। আর এই সম্পদ যদি অশ্লীলতার ছায়াতলে ধ্বংসের পথকে বেছে নেয়, তবে সমাজ বা রাষ্ট্র একসময় রসাতলে যাবে। তাই অশ্লীলতামুক্ত সমাজ গঠনে মাদ্রাসার অবদান স্বীকার করে নেওয়াটাই শ্রেয়। এরপরে আবার সুখী ও স্বাবলম্বী সমাজ গঠনে মাদ্রাসা শিক্ষার অবদান রয়েছে দৃষ্টির মধ্যেই। মাদ্রাসা শিক্ষার্থী কখনো কারো ক্ষতি করে না। কেননা, তাকে মাদ্রাসায় শিক্ষা দেওয়া হয়, হিংসা ও অহংকারমুক্ত জীবন গড়ার। শিক্ষা দেওয়া হয় তার দ্বারা মানুষের আর্থিক বা কায়িক সহযোগীতা পাওয়ার। তার দ্বারা যেন কখনো কারো উপকার বৈ ক্ষতিসাধন না হয়। মাদ্রাসা শিক্ষার্থী যেন নিজেই কারো সাথে ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত না হয়। বরং, সে যেন অন্যদের মাঝে সুষ্ঠ মিমাংসার দ্বারা পরস্পরের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে। এই সংস্কৃতি পেয়ে থাকে একজন মাদ্রাসা পড়–য়া। মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত একজন কখনো চুরি, ডাকাতি বা ছিনতাইকে নিজের পেশা বানায় না। কারন, এসকল ঘৃন্য কাজের দরূন সমাজে মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। এতে করে সমাজে মানুষে মানুষে কোন্দল সৃষ্টি হয়। অথচ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “প্রকৃত মুসলিম সেই যার হাত ও মুখ থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে।” (সহিহ বুখারী-৯) এর পাশাপাশী মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতি সমাজ সংস্কারক গঠনে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভুমিকা পালন করে আসছে। আর এটা এভাবে প্রমান হয় যে, মাদ্রাসা একজন শিক্ষার্থীকে ইসলামী শিক্ষায় গড়ে তোলে। আর ইসলামী শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং ইসলাম ধর্ম ও ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রেষ্ট ব্যাক্তি এবং তার ধর্ম সবচেয়ে শ্রেষ্ট ও তার ধর্মের ধর্মীয় শিক্ষাই মানবতার মুক্তির দিশা। এ কথার সমর্থন ও এ বিষয়টির পূর্ন নিশ্চয়তা বৃদ্ধি পায় পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মের ধর্মীয় গ্রন্থসমূহের এবং ধর্মীয় ব্যাক্তিবর্গ, গুরু, পন্ডিত বা সন্যাসীদের স্বীকারোক্তির দ্বারা। এবং এরকম স্বীকারোক্তি পাওয়া যায় বৌদ্ধ ধর্মের ধর্মীয় গ্রন্থ ‘দিঘানিকায়া’ -তে। তাতে লিখা আছে, “মানুষ যখন গৌতম বুদ্ধের ধর্ম ভুলে যাবে, তখন আরেকজন বুদ্ধ আসবেন, তাঁর নাম হবে মেত্তেয় মৈত্রেয়)” অর্থাৎ, শান্তির বুদ্ধ। উল্লেখ্য যে, গৌতম বুদ্ধের সময়কাল ছিল খ্রীস্টপূর্ব (৫৬৭-৪৯৫) বছর। এবং তার পরে রাহমাতুল্লীল আলামীন বা জগতবাসীর শান্তির বার্তাবাহক উপাধি দেওয়া হয় একমাত্র আমাদের নবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে। শিখদের ধর্মগ্রন্থ ‘গ্রন্থ সাহেব’ এর ১৭৪ পৃষ্ঠায় বর্নিত আছে, “তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও বেদ পরিয়া দেখিয়াছি। কিন্তু এই কুরআনই একমাত্র গ্রন্থ, যাহা কলি যুগে মানবের মুক্তি দিতে একমাত্র সমর্থ।” হিন্দু ধর্মের চারবেদের স্বীকৃতি ভবিষ্যপুরানে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে এক বিশাল পরিচ্ছেদ রয়েছে। এছাড়াও হিন্দুদের অথর্ববেদ, সামবেদ ও যর্জুবেদেও ইসলামের নবী সম্পর্কে অনেক গুনাবলী ও বর্ননা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে আছে। এর পাশাপাশী তাওরাত, যবুর ও ইঞ্জিলে যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাপারে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল সেই বিষয়টি পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বিভিন্ন জায়গায় বর্ননা করেছেন। এছাড়াও অমুসলিম মনীষি বা বিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গের মধ্য থেকে জর্জ বার্নাডশ, এডওয়ার্ড গিবনম, ঐতিহাসিক প্রফেসর ড্রেপার, কবি জন মিলটন, খ্রীষ্টান সন্যাসী বহিরা, ফ্রান্সের কমিউনিষ্ট সদস্য রোজের গারোদী, মাইকেল এইচ হার্ট, মাহাত্মা গান্ধী, স্যার পি. সি. রায়, স্বামী বিবেকানন্দ প্রমুখ হাজারো ব্যাক্তির স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়। সুতরাং এর দ্বারা একটা বিষয় সহজেই অনুমেয় যে, মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতি একজন শিক্ষার্থীকে যুগশ্রেষ্ট সমাজ সংস্কারকও বানাতে সক্ষম।
উপরিউক্ত সকল সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ থেকে একট বিষয় তো সহজেয় বোধগম্য হয় যে, মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতি ঐতিহ্য ও অবদানের দিক দিয়ে সর্বশ্রেষ্ট। এবং মানবতার কাঙ্খিত মুক্তি একমাত্র মাদ্রাসা শিক্ষা-সংস্কৃতির ঐতিহ্য ইতিহাস খুজলেই পাওয়া যাবে এবং অবদান শুধু চোখ খুললেই দেখা যাবে। এবং এই ঐতিহ্য যখন জাতি ভুলে যাবে তখনই বিপদের কালো মেঘ ধেয়ে আসবে।
তথ্যসুত্রঃ
* তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন।
* বুখারী শরীফ।
* তাহরীকে দারুল উলূম দেওবন্দ।
* আকাবিরে দেওবন্দ কিয়া থে।
* দেওবন্দ আন্দেলন : ইতিহাস ঐতিহ্য ও অবদান।
* কল্কি অবতার এবং মোহাম্মাদ সাহেব।
* ইসলাম একালের ধর্ম।
তাং-২২/১২/২০১৭ইং
-রচনায়
মুহাম্মাদ ওবাইদুল্লাহ