তাসনীমের লালশালু



Obaidullah Muhammad

                পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ ছেলেটির নাম তাসনীম। বয়স সবেমাত্র ছ’বছর। এটুকু ছেলেটা পুরো বাড়িটিকে জুড়ে খুশি ছড়ায়। তাসনীমরা যৌথ পরিবারের সদস্য। তাসনীমের বাবা তার দাদা-দাদীর একমাত্র সন্তান। চার বোনের পরে তাসনীমের আগমনে তার দাদা লাগাতার তিনদিন ব্যাপী নিজ কাচারীঘরকে হাতেম তা’ঈর মেহমানখানায় রূপ দিয়েছিলেন। তাসনীম তার মায়ের গর্ভে থাকাকালীন সময়ে ডাক্তারমশাই ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন যে,
-এই সন্তান জন্মের পরেই মারা যাবে অথবা সে বেচে যাবে বাকপ্রতিবন্ধি হয়ে।
কিন্তু আফসোসের বিষয় হচ্ছে ডাক্তারমশাই পড়া-লেখা করেছেন বিজ্ঞান নিয়ে। সুতরাং তার তো কোনোমতেই জ্যোতিষবিদ্যার উপর জোড় চলার কথা না। তাই তো আজ তাসনীমের কথা শুনতে শুনতেই সকলে ডাক্তার মশাইকে একবার করে স্বরণ করে। সবাই যখন ব্যস্ত থাকে তখন তাসনীমের কথা বলার আরেকজন সাথী সর্বদা উৎফুল্ল থাকে তার কথা শুনতে। যাকে দাদাজান আদর করে নাম দিয়েছিলেন লালশালু। শুরুর দিকে কয়েকদিন তাসনীম তাকে ভয় পেত। কিন্তু আস্তে আস্তে তাকে আপন করে নেয়। তাকে সকল প্রকার সুখ-দুঃখের কথা  বলে। কিন্তু সে কোনো জবাব দেয় না। কারণ সৃষ্টিগতভাবেই সে বাকহীন। সে সমাজে মানুষের সাথে বাস করলেও তাকে তাকে জাতিগত নামে তথা গরু বলে ডাকা হয়।
                  ওর দাদা খায়রুল মৃর্ধা সেই পাকিস্তান আমল থেকেই স’মিল ব্যবসায়ী। সংগ্রামের সময় তিনি পাড়ার যুবকদেরকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছিলেন। নিজের কড়ই বাগানের দক্ষিন দিকে একটি ঘর উঠিয়ে দিয়েছিলেন। সেখানে প্রতিদিন দুপুরের ভোজনশেষে তিনি সাতচল্লিশ পূর্ববর্তী সময়ের কাহিনী শোনাতেন। যুবকদের দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত থাকার জন্য দিল্লি থেকে ‘মারফি’ রেডিও কিনে এনেছিলেন। ৭ই মার্চের দিন যুবকদের একটি প্রতিনিধি দলকেও তিনি ঢাকা পাঠিয়েছিলেন নিজ খরচেই। মুক্তির সংগ্রাম শুরুর পরে সেই যুবকদেরকে তিনি ইন্ডিয়া পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। তাদের সকলের ঘরের মহিলাদেরকে নিজের ঘরে ঠাই করে দিয়েছিলেন। কিন্তু মাহাজন হওয়ার খাতিরে তিনি আর নিজ পাড়া ছাড়তে পারেন নি। বরং পাকিস্তানিদেরকে খাবার পৌছে দিতেন, পাড়ার স্কুলঘরটিকে মেরামত করিয়ে তাদের থাকতে দিয়েছিলেন। কিন্তু অপরদিকে তিনি আবার মুক্তিবাহীনিদের কাছে পাকিদের ষড়যন্ত্রের খবর পৌছে দিতেন স’মিলের কাজের ছেলে কালুকে দিয়ে। এভাবে করেই তিনি নিজের কারবার, পরিবার ও গাঁয়ের মুক্তিসেনাদের মা-বোন, স্ত্রী-কন্যাদেরকে পাকিদের থেকে রেহাই দিয়েছিলেন।
                        তাসনীম সকলের আদরের হওয়ায় তাকে এখনও স্কুল বা মাদ্রাসায় পাঠানো হয় নাই। তবে তাকে নিজ ঘরেই শিক্ষা দেওয়ার কার্যাবলি ঠিক করা হয়েছে। তার বড় বোনদেরকে প্রাথমিক শিক্ষা তথা ক্লাস ৫ এর পরে মাদ্রাসায় ভর্তি করে দেওয়া হয়। তাই সে তার বড়বোনদের থেকেই পড়া-শোনার হাতেখড়ি নেয়। রোজ দুপুরে খাবার খেয়ে কাচারি ঘরে দাদির কাছে গিয়ে কাহিনী শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ে। একে একে সে প্রায় সকল নবী-রাসুলদের কাহিনী জেনে ফেলে। কিন্তু বরাবরের মতো ইবরাহিম আঃ এর ইসমাঈল আঃ কে কুরবানি করতে নিয়ে যাওয়া এবং তার পরিবর্তে দুম্বা কুরবানি হওয়ার কাহিনী শোনার পরে জানতে চায় যে,
- আমাদের গরু-ছাগল কুরবানি করার মধ্যে ত্যাগ হয় কিভাবে।
- আমরা আল্লাহর হুকুম পালন করি। এর মধ্যেই আমাদের ত্যাগ রয়েছে। আর এমন কথা বলতে হয় না।
দাদির কথায় সে চুপ হয়ে গেলেও তার মনে বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
        তাসনীমের দাদা খুব দানশীল মানুষ। প্রত্যেক কুরবানির ঈদে তিনি একটি গরু কুরবানি করেন। এবং নিজেদের খাওয়ার উদ্দেশ্যে কিছু গোশত রেখে বাকিসব গরীবদের মাঝে বিলিয়ে দেন। তার দানশীলতার কারনে পাড়ার সকলে তাকে খুব ভালোবাসে। কিন্তু এদেখে গ্রামের কিছু নীতিহীন রাজনীতিবিদের শরীরে আগুন ধরে যায়। তারা তাকে প্রথমে নিজেদের দলে ভিড়াতে চায়। কিন্তু তিনি এতে রাজী না হলে তার নামে অপবাদ রটায় যে, তিনি নাকি যুদ্ধের সময় গ্রামের সকল বয়সের মেয়েদেরকে নিজের ঘরে আটকে রেখে পাকিদেরকে দিয়ে তাদের ইজ্জত লুটিয়েছেন। এসবের পরে মানুষ যখন আসল ইতিহাস জানতে পারে তখন তার প্রতি ভালোবাসা আরো বেড়ে যায়। এরপরে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলা করা হয়। তাকে আটক করা হয়। টানা নয় মাস তার উপরে চলে নির্যাতন। আর পাঁচদিন বাদে কুরবানি। খায়রুল সাহেবকে আটকের পর থেকে তার পরিবারের উপর নেমে আসে আর্থিক অনটন। একে একে লালশালুকে রেখে সব গরুগুলোই বিক্রি করে দিতে হয়। খায়রুল সাহেব তার ছেলেকে বলেন,
- এবারের ঈদেও কিন্তু কুরবানি করতে ভুলবে না।
- আব্বাজান! লালশালু ছাড়া আর কোনো গরু বাকি নেই।
- তাহলে লালশালুকেই কুরবানি করতে হবে। আমার কুরবানির উপরেই অনেকগুলো পরিবারের গরুর গোশত খাওয়া জোটে।
- কিন্তু, আব্বাজান! এর ফলে তো তাসনীম ভেঙ্গে পড়বে।
- আমি আর বেশি দিন বাঁচবো না। আমার মৃত্যুর আগেও আমি আমার দরজা থেকে গরীবদেরকে খালিহাত ফেরত যেতে দিতে চাই না। কুরবানির পরের দিন তাসনীমকে আমার কাছে নিয়ে আসবে।
- ঠিক আছে, আব্বাজান।
                           দাদার জেলে যাওয়ার পর থেকে তাসনীমের দিনের একটা বড় সময় কাটে লালশালুর সাথেই। দেখতে দেখতে এবারো কুরবানির ঈদ এসে গেল। ঈদের আগের দিন তাসনীমকে নতুন পাঞ্জাবি-পাজামা, জুতো কিনে দেওয়া হয়। সে ওগুলো অতি গোপনে লুকিয়ে রাখে কাউকেই দেখাতে চায় না। পাছে আবার ঈদ যদি পুরনো হয়ে যায়। ঈদের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই সে যায় লালশালুর কাছে। কিন্তু একি লালশালু যে কাঁদছে। সে লালশালুর গলা জড়িয়ে ধরে আদর করে জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে তার ? সে কাঁদছে কেন ?
লালশালু কোনো জবাব না দিয়ে চোয়ালটা তাসনীমের পিঠে ঠেকিয়ে অনবরত কেঁদেই যায়। তাসনীম দৌঁড়ে আসে বাড়িতে। সবাইকে বলে লালশালু কাদঁছে। সেও কাঁদতে শুরু করে। বাবা তাকে বলেন,
- তুমি তোমার গোসল করে নতুন জামা-কাপড় পরে লালশালুর কাছে যাও, দেখবে তার কান্না থেমে যাবে।
- সত্যি বলছো!
- হ্যাঁ।
- আম্মুউউঊ! আমাকে গোসল করিয়ে নতুন কাপড় পড়িয়ে দাও।
তাসনীমের বাবা জানেন যে, লালশালুর কান্না থামবার নয়। তাসনীমকে জামা-কাপড় পরিয়ে তার বাবা ঈদগাহে নিয়ে যান। ইমাম সাহেব বয়ানে ইবরাহিম আঃ এর কুরবানির ইতিহাস তুলে ধরে বলেন,
- কুরবানির দ্বারা আল্লাহর আমাদের কাছ থেকে ত্যাগ চান, যাতে করে আমরা তাকওয়া এবং খোদাভীতির অধিকারী হতে পারি। আমরা কুরবানি করবো আল্লাহকে খুশী করার লক্ষ্যে।...........
তাসনীমের মনে আবার সেই বিষয়টি ঘুরপাক খেয়ে ওঠে। “গরু কুরবানি করার দ্বারা প্রিয় বস্তু কুরবানি করার সাথে মিল কোথায়?”
ঈদের নামাজ শেষে তাসনীম বাড়িতে এসে দেখে লালশালু কেঁদেই চলছে। তাসনীম তাকে কান্না থামাতে বলে। কিন্তু সে কান্না থামায় না। শুধুই কেঁদে যায়। তাসনীম বলে,
- দেখো তুমি কান্না না থামালে কিন্তু আমি আজকে কোথাও যাবো না। কিচ্ছু খাব না। আমি কিন্তু সারাদিন কান্না করবো।
কিন্তু লালশালুর কান্না যেন বেঁড়েই চলছে। তাসনীম বাড়ির ভিতরে গিয়ে বালিশের নিচে মাথা দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে যায়। দুপুর বেলা ঘুম থেকে উঠে দেখে লালশালু নেই। কোথায় গেল সে? কাকে বলে সে এ বাড়ি থেকে পাঁ বাড়ালো? এত বড় সাহস সে কোথায় পেল?
তাসনীম তাকে খুঁজতে বের হতে উদ্দত হলো। তাসনীমের সেঝ বোন তাকে বললো যে,
- লালশালুকে কুরবানি করা হয়েছে।
তাসনীম সকলের দিকে তাকিয়ে দেখল। সকলের চোখ নিচের দিকে। সকলের মুখে বিষাদের ছায়া। তাসনীম চুপ করে ঘরের মাঝখানে দাড়িয়ে বললো, আমাকে দাদুর কাছে নিয়ে চলো। আমি তোমাদের সবার নামে দাদুর কাছে বিচার দিবো। সে কিছু না খেয়েই আবার গিয়ে বিছানায় পড়ে কাঁদতে লাগলো।
পরদিন তাকে নিয়ে পরিবারের সকলে দাদুর সাথে দেখা করতে গেলো। দাদুর কোলে মাথা দিয়ে সে কি কান্না। তাসনীমের বাবা আমতা আমতা করে বললো,
- কাল থেকে সে কারো সাথেই কথা বলে না। কিছুই খায় না। শুধু বলে আমাকে দাদুর কাছে নিয়ে চলো। তোমাদের সবার নামে বিচার দিবো।
তাসনীমের দাদু তার মাথায় হাত বুলিয়ে সান্তনা দেন। তারপর বলেন,
- দাদুভাই! কী হয়েছে ? তোমাকে কে কি বলেছে ?
- ওরা আমার লালশালুকে কুরবানি দিয়েছে। তুমি ওদের বিচার করবে।
- আচ্ছা ঠিক আছে। ওদের বিচার হবে। কিন্তু তুমি কি ইবরাহিম আঃ এর কুরবানির কথা শুনেছো ?
- হ্যাঁ। কিন্তু আল্লাহ তা’আলা ইবরাহিম আঃ কে তার প্রিয় বস্তু কুরবানি করতে বলেছেন। পরে তিনি তার ছেলে ইসমাঈল আঃ কে কুরবানি করতে নিয়ে যান। এরপরে একটি দুম্বা কুরবানি হয়ে যায়। এবং আল্লাহ তাদের উপরে খুশী হন।
- বাহ! তুমি তো সবকিছুই জানো। আল্লাহ মানুষের প্রিয় বস্তু দুনিয়া থেকে নিয়ে যান ঠিকই, কিন্তু যারা আল্লাহকে খুশী করতে পারে তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে পুরষ্কার দেন। তুমি কি চাওনা যে আল্লাহর তোমার উপর খুশী হয়ে তোমাকে দুনিয়া ও আখিরাতে পুরষ্কার দেন?
- হ্যাঁ।
- এইযে এইবারের কুরবানির ঈদে তুমি তোমার প্রিয় লালশালুকে কুরবানি দিয়েছো। এটা কার কুরবানির মতো হয়েছে, বলতে পারো ?
- কার ?
- ইবরাহিম আঃ এর মতো। তাই না?
- হ্যাঁ।
- সুতরাং, ইবরাহিম আঃ এর উপর যেমনি আল্লাহ খুশী হয়েছিলেন তেমনি আজ আল্লাহর তোমার উপরও খুশী হয়েছেন। তুমি কি তা জানো ?
- তাই নাকি! তাহলে এখন আমি আল্লাহর কাছে যা চাব তাই কি তিনি আমাকে দিবেন ?
- হ্যাঁ।
- তাহলে আমি তোমার জন্যেই প্রথমে দোয়া করব। তুমিই বলো আমি তোমার জন্য কি চাব আল্লাহর কাছে।
- তুমি আমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া কর যে, তিনি যেন আমাকে তার অতি শীগ্রই তার কাছে নিয়ে যান।
- ঠিক আছে। আল্লাহ যেন তোমাকে তার কাছে তাড়াতাড়িই নিয়ে যান। আমিন বলো।
- আমিন। তাহলে আমি তোমার বাবার কাছে বলে দেব তোমাকে যেন আরেকটা লালশালু কিনে দেয়। আর তুমি সামনের বছর আবার তাকে কুরবানি দিবে এবং আল্লাহর কাছে আমার আখিরাতের জন্য দোয়া করবে।
- ঠিক আছে, দাদুভাই!
সেইদিন সকলে বিদায় নিয়ে চলে আসলো। পরদিন সকালে তাসনীমের বাবা তাকে ডেকে বললো,
- তাসনীম তোমার দাদুকে আল্লাহ তার কাছে নিয়ে গেছে। চলো, তার সৎকার করতে হবে।
একমাস পরের এক সকালে তাসনীম ঘুম থেকে উঠে দেখল লালশালুর ঘরে আরেকটি লাল টুকটুকে গরু দাড়িয়ে আছে। তাসনীমের বাবা তাকে বললো এটা হচ্ছে তোমার নতুন লালশালু।

0 comments:

Post a Comment